রাজশাহীতে পুকুর গিলেছে ১৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

বুধবার, ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে পুকুর গিলেছে ১৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

রাজশাহীতে তিন ফসলি উর্বর জমি কেটে চলছে নির্বিচার পুকুর খনন। কৃষিজমি ধ্বংস করে গড়ে তোলা হচ্ছে বড় বড় বাণিজ্যিক পুকুর, যেখানে মাছচাষ করা হচ্ছে লাভের আশায়। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে উর্বর কৃষিজমি, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকট। সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা।

কৃষকদের অভিযোগ, রাজশাহীর দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাগমারা, মোহনপুর, পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলি জমি কেটে পুকুর খননের মহোৎসব চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভূমিদস্যুরা স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে রাতের আঁধারে এসব পুকুর খনন করছে। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হলেও বন্ধ হচ্ছে না এই আগ্রাসন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে রাজশাহী জেলায় নির্বিচার পুকুর খননের কারণে ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে জেলায় পুকুর ও জলাভূমির আয়তনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

একই সঙ্গে কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, অবৈধ ইটভাটা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক অবকাঠামো। ফলে আবাদযোগ্য জমির বড় অংশ স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চল ক্রমেই কৃষিশূন্য হয়ে পড়ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে উদ্বেগজনক ফারাক তৈরি হয়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে অভ্যন্তরীণ জলাভূমি ও পুকুরের আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টরে। অথচ ২০১৫ সালে এ আয়তন ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর। এর আগে প্রাকৃতিক জলাধারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ হাজার ৩৫৬ হেক্টর। গত আট বছরে শুধু পুকুর খননের কারণেই প্রায় ৯ হাজার ৪৫৪ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে।

এ ছাড়া অবৈধ ইটভাটা, আবাসন, শিল্পকারখানা ও সড়ক নির্মাণে আরও ৬ হাজার ৭০৫ হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। রাজশাহী জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে জেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ২৭৫টিতে- এক দশকে প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি। সরকারি হিসাবের বাইরেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত পুকুর রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মৎস্য দপ্তরের তথ্য বলছে,

পুকুর খননের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিবাদ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। দুর্গাপুর ও মোহনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। গত ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুর উপজেলার বারোপালশা গ্রামে অবৈধ পুকুর খননের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ভূমিদস্যুদের এক্সকেভেটরের আঘাতে কৃষক জুবায়ের আহমেদ (২৭) নিহত হন। এ ঘটনায় মামলা হলেও প্রকৃত অপরাধীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

কৃষক ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রাজশাহীতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ পুকুর ও শতাধিক অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যা প্রশাসনের নজরদারির বাইরে চলছে। মোহনপুরের বিদিরপুর এলাকার কৃষক মমিন প্রামাণিক বলেন, ‘প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ কাজ হচ্ছে।’

পবা উপজেলার কৃষকরা জানান, অধিক মুনাফার লোভে অনেক জমির মালিক পুকুর খননের অনুমতি দিচ্ছেন। ধান চাষের তুলনায় মাছচাষে খরচ কম ও লাভ বেশি হওয়ায় প্রভাবশালীরা এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের কাছেও পুকুর খননের দালালি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোদাগাড়ীর ফুলবাড়ি গ্রামের কৃষক সৈয়দ হোসেন বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করে বছরে যেখানে ৪০ হাজার টাকা পাওয়া যায়, সেখানে একই জমি পুকুর হিসেবে লিজ দিলে ৮০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। তাই অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে জমি লিজ দিচ্ছেন।’

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে অবৈধ পুকুর খনন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিলের মাঝখানে পুকুর করলে আশপাশের জমি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। চাষাবাদ অসম্ভব হয়ে যায়। এসব প্রতিরোধের দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের।’

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে পুকুর খননের ফলে উর্বর মাটির উপরের স্তর ধ্বংস হচ্ছে। জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, ‘কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পুকুর খননের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে অনুমতি ছাড়াই কোথাও পুকুর খননের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও রাতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

এই বিভাগের আরো খবর